কঠোর পরিশ্রমকেই হাতিয়ার করে এভারেষ্ট জয় মলয়ের!

 

দামাল ছেলের চোখে হাজার স্বপ্ন জুটেছে, দিকদিগন্ত ডাক পাঠালো ইচ্ছে ছুটেছে……. – এই স্বপ্নকেই জয় করার লক্ষে ছুটে যান দেশে বিদেশে। রেকর্ড সময়ে এভারেষ্ট জয় করে নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করেছেন মলয় মুখার্জি। তার স্বপ্নারোহনের পথে চড়াই উতরাই নিয়ে, তার একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমাদের প্রতিনিধি নিশান মজুমদার

প্রঃ পর্বতারোহনের জগতে প্রবেশ কি ভাবে ?
মলয়ঃ ছোটবেলা থেকে বই পড়ার একটা অভ্যাস ছিল, বিশেষ করে যখন বিভূতিভূষনের চাঁদের পাহাড় পড়ছি বা ভ্রমন পত্রিকা পড়ছি তখন থেকেই মনে হত আমি বেড়াতে বেড়াতে যাবো। আমি জানতামই না পর্বতারোহন কি জিনিস। আমার মূলত পাহাড় আর সবুজ খুব ভালো লাগে। তো সেরকম যখন ভাবছি কোথাও ঘুরতে যাবো বা ক্যাম্পে যাবো, তখন মামা বলেন যে এখানে ক্যাম্প হয় তুই তো ক্যাম্পেই যেতে পারিস। এখানে বলে রাখি তার বছর দুয়েক আগেই মামা এক রক ক্লাইম্বিং কোর্স করে এসেছেন।

আমি জানতে পারি যে আমাদের পাড়ারই এক ছেলে ওই ক্যাম্প করেছে। অর্থাৎ আমি যে ক্লাব থেকে বড় হলাম আর কি বা এখনো যে ক্লাবের সদস্য়, অর্থাৎ হাওড়া ডিস্ট্রিক্ট মাউন্টেনিয়ার্স এন্ড টেকার্স অ্যসোসিয়েশন সেখানেই আমি ১৯৯৮ সালে কোর্স করতে যাই। ট্রেনিং-এর জন্য যখন আমি পুরুলিয়া গেলাম, আমার জীবনটা পুরো চেঞ্জ হয়ে গেল। এই ভাবেই পর্বতারোহনের জগতে আমার প্রবেশ।

প্রঃ প্রথম অভিযান কবে, কোথায় এবং কিভাবে?
মলয়ঃ পুরুলিয়ায় থাকাকালীন ওখানকার মানুষ, পাহাড়, বন-জঙ্গল আমায় খুব আকর্ষণ করেছিল। এবার ওখান থেকে ফিরে আসলাম, ওখান ফিরে এসে জানতে পারি যে ক্যাম্প থেকে প্রত্যেক বছরই একটা প্র্যাক্টিস হয়। তো আমি বায়না ধরলাম আমিও যাব। দাদারা বললেন যে তুই তো মাঠে খেলাধুলা করিস তুই যেতে পারবি। এর পর খুব স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আমি পুরুলিয়া যেতে শুরু করি। এরপর আমি জানতে পারি ইনস্টিটিউশন থেকে জানতে পারি যে প্রতি বছরও অভিযান হয়।

তারপর ধীরে ধীরে ফটো দেখতে থাকি, পাহাড়, বন-জঙ্গল, বরফের ছবি দেখি। বরফের ছবি সবারই ভালো লাগে। তখন থেকেই ঠিক করে নিই যে আমিও যাব। এই ভাবেই আমার প্রথম অভিযান ১৯৯৯ সালে, কেদার ডোমে। এছাড়াও আমি আমার গুরু স্বরাজ ঘোষের সাথে গঙ্গাসাগর থেকে গোমুখ, ২৫০০ কিমি দূষন মুক্ত গঙ্গা বার্তা নিয়ে হাঁটি।

প্রঃ একজন সাধারণ মানুষ থেকে পর্বতারোহী, এই যাত্রাপথে বিভূতিভূষনের শঙ্করের ভুমিকা ঠিক কতটা?
মলয়ঃ আমার জীবনে শঙ্করের একটা বিশাল ভুমিকা রয়েছে। তা ছাড়াও বিভূতিভূষনের অনান্য গল্প, ভ্রমন পত্রিকা এই সব পড়তাম। আর কোন ঘোরার জায়গা দেখলেই ভাবতাম এখানে কি ভাবে যাওয়া যায়, কত খরচ। আমি কবে যেতে পারবো, এই সবই ক্যালকুলেশন করতাম।

প্রঃ বর্তমানে আপনি বিদেশে ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন, কি মনে হয় ভারতের পরিকাঠামো কি উন্নত নাকি আরও উন্নতি করতে হবে ?
মলয়ঃ বর্তমানে স্পোর্টস ক্লাইম্বিং টোকিও অলিম্পিকে যুক্ত হয়েছে। স্পোর্টস ক্লাইম্বিং বা রক ক্লাইম্বিং পর্বতারোহনেরই একটা পার্ট। এর ফলে নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা অনেকটা আগ্রহী হয়েছে। তবে সব থেকে ভালো দিক হচ্ছে বিগত কয়েক বছরে ক্যাম্পিংটা করতে যাচ্ছে। খুব ভালো মাপের পর্বত আরোহন হচ্ছে যে, সেটা বলবো বলবো না। কিন্তু বেঙ্গলের ছেলে-মেয়েরা ভালো কাজ করছে। কিন্তু যেটা সব থেকে বড়ো আকারে হচ্ছে সেটা হচ্ছে ক্যাম্পিংটা। এরকম অনেক ছেলে-মেয়েই আছে যারা হিমাচল, গাড়োয়াল বা লাদাখ এই সব জায়গায় ছোট ছোট অ্যডভেঞ্চার করতে চলে যাচ্ছে। পর্বতারোহনের অন্যতম একটা পার্ট হল ক্যাম্পিং। তো আশা রাখি যে সামনের দিন গুলোতে বাংলার ছেলে-মেয়েরা বা নতুন প্রজন্ম অনেক ভালো কাজ করবে।

প্রঃ এভারেস্ট চড়তে ঠিক কতটা কঠোর পরিশ্রম করতে হয়?
মলয়ঃ আমি মনে করি কোন কিছুই শর্টকাটে পাওয়া যায় না। কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। ভাগ্য একবার সাথে থাকলেও পরবর্তী ক্ষেত্রে নাও থাকতে পারে, কিন্তু হার্ড ওয়ার্ক প্রত্যেকবার তোমার জয় নিশ্চিত করবে। অর্থাৎ সস্তায় কোন ভালো জিনিস হয় না। আমি এভারেস্টে ওঠার আগে বছরের পর বছর পাগলের মত প্র্যাক্টিস করেছি। এখনোও করি। কখনও একটু কম, কখনও একটু বেশী। একটা রুটিনে থাকতে হয়। (হেসে) কিন্তু রিসেন্টলি বাংলাদেশে গিয়েছিলাম প্রচুর খাওয়া দাওয়া করেছি, ওজন বেড়ে গেছে। কিন্তু আমি জানি এক্সপিডিশনের আগে আমি দারুন ভাবে প্রস্তুত হয়ে যাবো। ওয়েট ট্রেনিং করা, রানিং করা এইসব ভাবে। আমি ট্রেনিং ক্যাম্পে ছেলে-মেয়েদের বলি প্র্যাকটিস করো। যে প্র্যাকটিস করে সে, সেই সুফলটা উপরে গেলেই পাবে।

প্রঃ এভারেস্ট জয়ের যে একটা অনুভূতি সেটা যদি একটু বলেন।
মলয়ঃ (হেসে) হাওড়ার রামরাজাতলার নিম্নবিত্ত পরিবারের একটা ছেলে, এত কষ্ট করে নিজের স্বপ্নকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছে। (কিছুক্ষন চুপ করে) যখন এভারেস্ট সামিট করছি তখন তো একটা আলাদাই অনুভূতি থাকে। অনেকের আশীর্বাদ, ভালোবাসা ছিলো আমার সঙ্গে। রামরাজাতলার একটা এই রকম পরিবারের ছেলে, সে রেকর্ড টাইমে এভারেস্ট ক্লাইম্ব করছে, সত্যি আমি নিজেও ভাবতে পারিনি। আর আমি বিশ্বাস করি মানুষের আশীর্বাদ, ভালোবাসার একটা দাম আছে। যাই হোক যখন উঠেছি চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছে, কিন্তু তখনও আমি ভাবছিলাম আমায় সুস্থ অবস্থায় নীচে নামতে হবে, আমায় আমার টিমকে নিয়ে নীচে ফিরে আসতে হবে।

প্রঃ এত মানুষের ভালোবাসা, আশীর্বাদ যখন থাকে তখন পরাজয়ের ভয় মনের কোনে বাসা বাঁধে, সেটাকে কিভাবে সামাল দিয়েছিলেন?
মলয়ঃ তা তো একটু থাকবেই। কিন্তু আমি মনে করি যে ভাগ্য তোমার সাথ একবার দেবে, দু-বার দেবে কিন্তু কঠোর পরিশ্রম সব সময় তোমার সাথ দেবে। আমি নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে কঠোর পরিশ্রম করেছি, তাই নিজের পরিশ্রমের উপর ভরসা ছিল।

প্রঃ বর্তমানে এভারেস্টে দূষণের পরিমান বেড়ে যাচ্ছে এক্ষেত্রে একজন পর্বতারোহী হিসাবে আপনার মতামত কি?
মলয়ঃ দূষনটা তো হবেই, কিছু করার নেই। আমরা সচেষ্ট এই বিষয় সচেষ্ট হতে পারি। নেপাল সরকার এর জন্য একটা ভালো পরিমান অর্থ পায়। এটা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। শুধু মাত্র তাদের দায়িত্ব নয়, এটা আমাদের মত পর্বতারোহীদেরও কিছুটা নজর রাখতে হবে যতটা কম দূষণ হয়। বর্তমান যা অবস্থা, অর্থাৎ করোনার জন্য এবছর তিব্বত দিয়ে এক্সপিডিশন বাতিল হবে, আর সেই ভিড়টা এসে পড়বে নেপালে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমি বলতে পাড়ি যে, এবছর একটা বড় দুর্ঘটনার ঘটবে। এটা আমি আমার এত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।

 

Spread the love

Related posts

Comment here